মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলা প্রশাসনের পটভূমি

নাগেশ্বরী উপজেলার পটভূমিঃ

            অতীতে এ উপজেলা প্রাচীন কামরুপ বা প্রাক জ্যোতিষপুর রাজ্যের অধীনে ছিল। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের শাসনকর্তা গিয়াসুদ্দিন খিলজী কামরুপ দখল করেন। এ সময় ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকা অর্থাৎ সমগ্র নাগেশ্বরী তাঁর হস্তগত হয়। বাদশা মোহাম্মদ শাহর আদেশে তাঁর ভাগ্নে মালিক খসরু কুড়িগ্রামের ব্রক্ষ্মপুত্র নদ দিয়ে চীন বিজয়ে অগ্রসর হন। কিন্তু অতিবৃষ্টি দুর্গম পথ ও পাহাড়ী ঢলের কারণে বিপক্ষ দলের আক্রমনের শিকার হয়ে এক লক্ষ অশ্বারোহী বাহিনী থাকা সত্বেও তিনি বিফল হয়ে ফিরে আসেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অহোমগণ ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পূর্বাংশ (গোয়ালপাড়া জেলা ব্যতীত সমগ্র আসাম অঞ্চল) দখল করে এর নাম করণ করেন অহম রাজ্য। এ সময় কামরুপ রাজ্যের পশ্চিম সীমানায় কামাতাপুর নামে একটি পৃথক রাজ্য স্থাপিত হয়। এ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল বর্তমান কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজিবপুর ব্যতীত কুড়িগ্রামের সমগ্র অঞ্চল ও আসামের গোয়ালপাড়া এবং ধুবড়ী। সে সময় নাগেশ্বরী কামাতাপুর রাজ্যের অধীনস্থ ছিল। ভূরুঙ্গামারী বাসষ্ট্যান্ডের নিকটবর্তী কামাতা আঙ্গারিয়া গ্রাম কামাতাপুর রাজ্যের ঐতিহ্য বা সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

 

         গৌড়ের সুলতান বারবক শাহ্ এর সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজী ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দে কামরুপ জয় করেন। এ সময় বৃহত্তর রংপুর জেলা তাঁর হস্তগত হয়। নাগেশ্বরী সন্তোষপুর নামক স্থানে শাহ্ ইসমাইল গাজীর সাথে কামরুপের অধিপতি কামেশ্বরের যুদ্ধ হয় বলে ধারণা করা হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে কামাতাপুর রাজ্যে খেন বংশীয় হিন্দু রাজারা কিছু কালের জন্য রাজত্ব করেন। ১৫০৬ সালে তরবক খা নাগেশ্বরী তথা কামাতাপুর রাজ্য দখল করতে বিশাল নৌবহর নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে আগমন করেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। পরবর্তীতে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র দুর্বল উত্তরাধীকারীদের সুযোগে বিষ্ণু নামক একজন কোচ সর্দার আফগান শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন বৃহত্তর রংপুরের একাংশ দখল করে এর নামকরণ করেন কোচ বিহার। এ সময় নাগেশ্বরী কোচ বিহারে অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোচ বিহার স্বাধীন রাজ্য হিসেবে বিরাজমান ছিল।

 

        ১৫৪১ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ বাংলাদেশ দখল করার সময় নাগেশ্বরী অঞ্চলকে কোচবিহার থেকে সুবে বাংলা প্রদেশের অধীনস্থ করেন। তিনি শাসন কার্যের সুবিধার্থে তৎকালীন পুরো বাংলাকে ১৯টি সরকারে বিভক্ত করেন। এর একটি হলো ঘোড়া ঘাট সরকার (বর্তমানে দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভূক্ত)। নাগেশ্বরী তখন ঘোড়াঘাট সরকারের অধীনে ছিল। তিনি এর কিছু দিন পর ঘোড়াঘাট সরকারের কিছু অংশ তথা বাহারবন্দ (বর্তমানে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা) ভিতরবন্দ (বর্তমানে নাগেশ্বরী উপজেলা) পাঙ্গা (বর্তমানের বড়বাড়ী) কোটেশ্বর, গয়বাড়ী (বর্তমানের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা) পূর্বাভাগ (বর্তমানের ফুলবাড়ী উপজেলা) পাটগ্রাম (লালমনির হাট জেলার অধীনস্থ উপজেলা) ভবানীগঞ্জ (গাইবান্ধা জেলার অধীনন্থ উপজেলা) প্রভৃতি নিয়ে বাঙ্গালভূম সরকার গঠন করেন। যেহেতু এ এলাকা সবাই দখল করতে চাইত তাই শেরশাহ এ অঞ্চলকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য এর নাম করণ করেন ‘‘সরকার বাঙ্গালভূম’’ বা বাংলার ভূমি। শের শাহ’র মৃত্যুর পর কোচ রাজা ১৫৪৫ সালে সরকার বাঙ্গালভূম নিজ দখলে নিয়ে আসেন। সম্রাট আকবরের সময়ও এ অঞ্চল মোঘলরা কোচদের কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি। ১৬৬১ সালে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা কোচবিহার আক্রমমণ করেন এবং সরকার বাঙ্গালভূম উদ্ধার করেন। এ সময় মীর জুমলা ভূরুঙ্গামারী উপজেলার মোঘলকাটায় প্রায় তিন বছর অবস্থান করেন। দ্বিতীয় বার তিনি ফিরে যাবার সময় ১৬৬৩ সালে পথিমধ্যে অসুস্থ্য হয়ে আসামের মানকের চরে মৃত্যু বরণ করেন। আসামের একটি পাহাড়ে তাঁকে সমাহিত  করা হয। এ পাহাড়টি বর্তমানে মীর জুমলা পাহাড় নামে পরিচিত। তখন থেকে নাগেশ্বরী মোঘল এবং তাদের সৃষ্ট জমিদারদের দ্বারা শাসিত হতো।

 

থানা সৃষ্টির প্রেক্ষাপট :

         ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের ফলাফলকে এ অঞ্চলের মানুষ মেনে নেয়নি। এ কারণে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার কিছু অংশের স্থানীয় অধিবাসী একটি স্বাধীন রাজ্য ঘোষনা করে এবং এ স্বাধীন রাজ্যের নাম করণ করেন স্বাধীন রঙ্গপুর রাজ্য। নুরুলদীন এ রাজ্যের নবাব হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে জমিদাররা অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত নাগেশ্বরী অঞ্চল মুক্ত রাখেন। অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ইংরেজরা স্বাধীন রঙ্গপুর দখল করার জন্য দীর্ঘদিন পর্যন্ত যুদ্ধ পরিচালনা করে। এ যুদ্ধ মোকাবেলা করার জন্য নবাব নুরুলদীন রঙ্গপুর রাজ্যকে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করেন। ইংরেজদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রত্যেকটি অংশকে একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি দেন ও প্রত্যেক ইউনিটে সেনা ছাউনি নির্মাণকরেন। এ সেনা ছাউনিতে নবাব নুরুলদীনের সৈনিকরা অবস্থান করতো বলে স্থানীয় ভাষায় লোকজন বলতো যে, সৈনিকরা সেনা ছাউনিতে থানিয়েছে অর্থাৎ অবস্থান নিয়েছে। আর এই সেনা ছাউনিকে বলা হতো ‘‘থানা’’। এভাবেই সে সময়ের থানা নামক প্রশাসনিক এককের উদ্ভব ঘটে।  নাগেশ্বরী’র পায়ড়াডাঙ্গা ছিল নবাব নুরুলদীন প্রতিষ্ঠিত একটি থানা যার অন্তর্গত ছিল বর্তমান নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গমারী ও ফুলবাড়ী উপজেলা। যা শাসিত হতো অভয়গীর নামক একজন বীর সেনাপতি বা থানাদার কর্তৃক। বর্তমানে এটি পায়ড়াডাঙ্গা মঠ বলে পরিচিত। এভাবেই নবাব নুরুলদীন এর আমলে প্রথম ‘‘থানা’’ ধারনাটির জন্ম হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ষ্টেশনের বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে নুরুলদীন ব্যবহৃত ‘‘থানা’’ শব্দটি গৃহীত হয়।

 

থানা সৃষ্টির সময় :

          অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশকে রঙ্গপুর রাজ্যের পতন হয় এবং নাগেশ্বরী থানা এ দেশের ইংরেজ কর্তৃক অধিকৃত সর্বশেষ স্বাধীন থানা/এলাকা। কর্ণ ওয়ালিশ কোড অনুযায়ী ইংরেজরা বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে পুলিশ ষ্টেশন স্থাপন করলেও নাগেশ্বরী পুলিশ ষ্টেশন স্থাপিত হয় অষ্টাদশ শতকের প্রথম দশকে। উল্লেখ্য যে ইংরেজরা এ উপজেলা দখল করার পর নাগেশ্বরী থানাকে পায়রাডাঙ্গায় পুন: প্রতিষ্ঠা না করে পায়রাডাঙ্গার ৩ মাইল উত্তরে হলদিকুড়া ব্রীজের নিকট থানা স্থাপন করেন। ১৯১১ সালে নাগেশ্বরীকে ভেঙ্গে ভূরুঙ্গামরী নামক অন্য একটি থানা গঠণ করা হয়।

 

উপজেলায় উন্নীত করণ :

         এরশাদ সরকার আসার পর প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে থানাকে মান উন্নীত থানায় রুপান্তর করেন। এসব মান উন্নীত থানাকে পরবর্তীতে উপজেলা হিসেবে নাম করণ করা হয় এবং প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে মহুকুমা বিলুপ্ত করা হয়। ১৪ এপ্রিল ১৯৮৪ তারিখে নাগেশ্বরী থানাকে উপজেলায় রুপান্তর করা হয়।

 

 

নামকরণ :

          নাগেশ্বরী নদীর নাম করণের সাথে জড়িয়ে আছে নাগেশ্বরী উপজেলার নাম করণ। নাগেশ্বরী নদীর নাম অনুযায়ী এ এলাকার নাম হয় নাগেশ্বরী। নাগেশ্বরী নদীর নাম করণ নিয়ে দু’টি মত প্রচলিত আছে।   নাগাসন্যাসীরা পুঁজা অর্চনা করতে আসতো নাগেশ্বরী মহাবিদ্যালয়ের পশ্চিমে নাগেশ্বরী নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরে। এ থেকে এ নদীর নাম নাগেশ্বরী । আবার কেউ কেউ মনে করেন, এ নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির নাগ বা সাপ, যেমন-শীষ নাগ, কাল নাগ, পঙ্খীরাজ নাগ, দুধ নাগ ইত্যাদি থাকতো। তাই এ নদীর নাম হয়েছে নাগেশ্বরী। আর নাগেশ্বরী নদীর নাম অনুযায়ী এলাকার নাম হয়েছে নাগেশ্বরী। বর্তমানে নাগেশ্বরী নদী মৃত হয়ে নাগেশ্বরী বিলে রুপান্তরিত হয়েছে।